ভারতের আহমেদাবাদ বিমানবন্দরের কাছে এয়ার ইন্ডিয়ার লন্ডনগামী একটি ফ্লাইট বিধ্বস্ত হয়েছে। ফ্লাইটে ২৪২ জন যাত্রী ছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে গেছে জরুরি সহায়তাকারী দলের সদস্যরা। তবে এই দুর্ঘটনায় হতাহতের বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি কর্তৃপক্ষ।
এনডিটিভি ও টাইমস অব ইন্ডিয়াসহ ভারতের বিভিন্ন সংবাদ ও গণমাধ্যম জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার দুপুরে আহমেদাবাদের সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরেই এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয়।
আহমেদাবাদের সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, বিমানবন্দরটি বর্তমানে চালু নেই। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত সব বিমান চলাচল স্থগিত করা হয়েছে।
লন্ডনের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া উড়োজাহাজটি শহরের মেঘানি এলাকায় আছড়ে পড়ে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে ঘটনাস্থল থেকে কালো ধোঁয়া উড়তে দেখা যাচ্ছে। এতে আগুনের ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ায় নিরাপত্তার কারণে আশপাশের সড়কগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল অধিদপ্তরের প্রধান ফয়েজ আহমেদ কিদওয়াই মার্কিন বার্তা সংস্থা এপিকে জানিয়েছেন, উড়োজাহাজটি মেঘানি নগর নামক একটি আবাসিক এলাকায় বিধ্বস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, উড়োজাহাজটিতে ২৩২ জন যাত্রী এবং ১২ জন ক্রু সদস্য ছিলেন।
বিধ্বস্ত উড়োজাহাজটিতে থাকা যাত্রীদের বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে এয়ার ইন্ডিয়া। এআই ১৭১ ফ্লাইটিতে ১৬৯ জন ভারতীয়, ৫৩ জন ব্রিটিশ, একজন কানাডিয়ান এবং সাতজন পর্তুগিজ নাগরিক ছিলেন। বিমান সংস্থা জানিয়েছে, আহতদের নিকটতম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
উড়োজাহাজটিতে থাকা ২৪২ জন আরোহীর মধ্যে দুজন পাইলট এবং ১০ জন কেবিন ক্রু ছিলেন। যদিও ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা আগে বলেছিলেন, উড়োজাহাজটিতে ২৪৪ জন যাত্রী ছিলেন। পাইলটের ৮,২০০ ঘণ্টা এবং কো-পাইলটের ১,১০০ ঘণ্টা উড়োজাহাজ উড়ানোর অভিজ্ঞতা ছিলো।
ফ্লাইটি আহমেদাবাদ থেকে ভারতীয় সময় দুপুর ১:৩৯ মিনিটে ২৩ নম্বর রানওয়ে থেকে ছেড়ে যায়। বিধ্বস্ত হবার আগে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে মে ডে কল দেয়, কিন্তু এরপর উড়োজাহাজ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায় না।
ফ্লাইট ট্রাকিং ডাটা অনুসারে, বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনারটি স্থানীয় সময় দুপুর ১:৩৮ মিনিটে আহমেদাবাদ থেকে লন্ডন গ্যাটউইকের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। ফ্লাইট ট্র্যাকিং ডেটা উড়োজাহাজটিকে ৬২৫ ফুট উচ্চতায় রেখে শেষ হয় এবং সিগন্যাল হারিয়ে যায়।
ভারতের বিমান পরিবহনমন্ত্রী কিঞ্জারপু রামমোহন নাইডু জানান, দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় আছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং সমস্ত বিমান ও জরুরি প্রতিক্রিয়া সংস্থাগুলোকে দ্রুত এবং সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দিয়েছি। উদ্ধার দলগুলোকে একত্রিত করা হয়েছে এবং ঘটনাস্থলে চিকিৎসা ও ত্রাণ সহায়তা দ্রুত পৌঁছে দেয়ার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। আমার প্রার্থনা উড়োজাহাজে থাকা সকল যাত্রী এবং তাদের পরিবারের সাথে রয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আরেকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, উড়োজাহাজটি উড্ডয়নের পরপরই নিচু দিয়ে উড়ছিলো এবং উচ্চতা বাড়ানোর চেষ্টা করছিলো। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই এটি মাটিতে আছড়ে পড়ে এবং বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হলে বিশালকার একটি আগুনের গোলায় পরিণত হয়। স্থানীয় সময় দুপুর একটা ৩৮ মিনিটে এয়ার ইন্ডিয়ার উড়োজাহাজটি প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে উড়েছিলো।
এয়ার ইন্ডিয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আহমেদাবাদ থেকে লন্ডনগামী ফ্লাইট নম্বর এআই ১৭১, দুর্ঘটনায় শিকার হয়েছে। এনিয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আরও আপডেট দেয়া হবে।
ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া দৃশ্যে দেখা যাচ্ছে, মাটি থেকে ধূসর ধোঁয়ার ঘন কুণ্ডলী উঠতে দেখা যাচ্ছে। কমপক্ষে দুই ডজন অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছেছে এবং কিছু আহতদের হাসপাতালে নিয়ে গেছে। পুলিশ এলাকা থেকে যান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে।
দীর্ঘ যাত্রার জন্য সেটিতে প্রচুর জ্বালানি ছিলো। বিধ্বস্তের সময় জ্বালানিতে বিস্ফোরণের পর উড়োজাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। উদ্ধার অভিযান পরিচালনার জন্য একাধিক ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট ও অ্যাম্বুলেন্স দুর্ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে।
যাত্রীবাহী উড়োজাহাজের চলাচল অনুসরণকারী ওয়েবসাইট- ফ্লাইট রাডার জানিয়েছে, এয়ার ইন্ডিয়ার উড়োজাহাজটির আহমেদাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে লন্ডন গ্যাটউইক বিমানবন্দরের উদ্দেশে স্থানীয় সময় সকাল ০৯:৫০ মিনিটে উড্ডয়নের কথা ছিলো। এর আগমনের সময় ছিলো স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা। উড্ডয়নের এক মিনিটেরও কম সময় পরে, স্থানীয় সময় সকাল দশটায় উড়োজাহাজটির সিগন্যালটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল অধিদপ্তর (ডিজিসিএ) বোয়িংয়ের একটি সম্ভাব্য কারিগরি দলসহ আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে। কর্মকর্তারা এখনও দুর্ঘটনার সন্দেহজনক কারণ সম্পর্কে কোনো বিবৃতি প্রকাশ করেননি।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক রুটে জ্বালানির অতিরিক্ত বোঝা দুর্ঘটনা-পরবর্তী আগুনকে আরও খারাপ করে তুলতে পারে, যা উদ্ধার প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলতে পারে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ভূপেন্দ্র প্যাটেল, রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হর্ষ সাংঘভি এবং আহমেদাবাদ পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে দুর্ঘটনাটি নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, কেন্দ্রীয় সরকার দুর্ঘটনার পরবর্তী পরিস্থিতি এবং তদন্ত পরিচালনায় রাজ্যকে প্রয়োজনীয় সকল সহায়তা প্রদান করবে।
